চারপাশে তাকালে কি মনে হয়? আমরা কি ঢাকায় আছি, নাকি দুবাই বা সিঙ্গাপুরের কোনো সস্তা সংস্করণে বসবাস করছি?
আজকাল আমাদের দেশের আর্কিটেকচার বা স্থাপত্যশৈলী দেখে মনে হয় আমরা যেন এক অদ্ভুত ‘স্মৃতিভ্রম’ বা অ্যামনেশিয়ায় ভুগছি। সবাই এমন বিল্ডিং ডিজাইন করতে ব্যস্ত যা দেখতে ‘বিদেশি’, চকচকে এবং তথাকথিত ‘মডার্ন’। কিন্তু এই অন্ধ অনুকরণে আমরা যেটা ভুলে যাচ্ছি, তা হলো আমাদের নিজেদের শেকড়, আমাদের হাজার বছরের পুরোনো সংস্কৃতি এবং সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, আমাদের আবহাওয়া।
আসুন একটু আড্ডা দেওয়া যাক কেন আমাদের এই ‘বিদেশি’ সাজার চেষ্টা আসলে আমাদের জন্যই আত্মঘাতী হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
আমাদের আবহাওয়া ট্রপিক্যাল মনসুন বা ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ুর অন্তর্গত। মানে হলো, এখানে প্রচুর রোদ, গরম এবং বৃষ্টি হয়। এখন আপনি যদি নিউ ইয়র্ক বা লন্ডনের মতো পুরো বিল্ডিং কাঁচ দিয়ে মুড়িয়ে দেন, তাহলে কী হবে?
শীতপ্রধান দেশে কাঁচের বিল্ডিং বানানো হয় যাতে সূর্যের তাপ ভেতরে ঢুকে ঘর গরম রাখে, যাকে বলে গ্রিনহাউস এফেক্ট। আর আমাদের দেশে? আমরা সেই একই ডিজাইন কপি করে আমাদের বিল্ডিংগুলোকে একেকটা ‘সোলার ওভেন’ বা অগ্নিকুণ্ড বানিয়ে ফেলছি।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় যেসব বিল্ডিংয়ে কাঁচের ব্যবহার বেশি, সেখানে এসির ব্যবহার বাড়ে জ্যামিতিক হারে। লালমাটিয়ায় করা এক জরিপে দেখা গেছে, এসি ছাড়া একটা সাধারণ ফ্ল্যাটে যেখানে মাসে ৪৫০-৫০০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হয়, সেখানে কাঁচঘেরা এসি নির্ভর ফ্ল্যাটে খরচ হয় ১৭০০ কিলোওয়াটেরও বেশি! অর্থাৎ, শুধুমাত্র ‘ফরেন লুক’ আনার জন্য আমরা তিনগুণেরও বেশি শক্তি অপচয় করছি।
একসময় বাঙালি বাড়ির প্রাণ ছিল ‘উঠান’ বা কোর্টইয়ার্ড। গ্রামের বাড়ি হোক বা পুরোনো ঢাকার বাড়ি, মাঝখানের এই খোলা জায়গাটাই ছিল পরিবারের হৃৎপিণ্ড। বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা তো ছিলই, তার চেয়ে বড় কথা, এখানে বাড়ির মহিলারা গল্প করতেন, বাচ্চারা খেলাধুলা করত।
এটাকে বলা হতো ‘প্যাসিভ কুলিং’ বা প্রাকৃতিকভাবে ঘর ঠান্ডা রাখার কৌশল। গরম বাতাস উপরে উঠে যেত আর নিচ দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকত।
এখন আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট কালচারে সেই উঠান হারিয়ে গেছে। তার জায়গা দখল করেছে নিচতলার অন্ধকার পার্কিং লট। আমরা এখন লিফট দিয়ে সোজা নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিই। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে, সেটাও অনেক সময় জানি না। আমাদের আর্কিটেকচার আমাদের অসামাজিক করে তুলছে।
আমাদের মাটির সাথে মিশে আছে ইট আর পোড়ামাটির গন্ধ। অথচ আমরা এখন ঝুঁকছি অ্যালুমিনিয়াম আর গ্লাসের দিকে। কিন্তু আমাদের ইতিহাস কি তাই বলে?
আমাদের স্থাপত্যের ‘গোল্ডেন পিরিয়ড’ বা স্বর্ণযুগের স্থপতি মাজহারুল ইসলাম বা লুই আই কানের কাজগুলো দেখুন। লুই কানের জাতীয় সংসদ ভবনের কথাই ধরুন। তিনি কি বিশাল কোনো কাঁচের টাওয়ার বানিয়েছিলেন? না। তিনি কংক্রিট আর ইটের ব্যবহার করে এমন এক স্থাপত্য তৈরি করেছেন যা রোদের তাপকে আটকাতে পারে, কিন্তু বাতাস আর আলোকে ভেতরে আসতে দেয়। একেই বলে স্মার্ট ডিজাইন।
তবে সব আশা শেষ হয়ে যায়নি। আমাদের বর্তমান সময়ের কিছু স্থপতি বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে শেকড় আঁকড়ে ধরেও আধুনিক হওয়া যায়।
লিজেন্ডদের পথচলা: প্রথমে আসি তাদের কথায়, যারা আমাদের স্থাপত্যকে বিশ্বমঞ্চে নিয়ে গেছেন। মেরিনা তাবাসসুমের ‘বাইত উর রউফ’ মসজিদের কথা শুনেছেন? সেখানে কোনো এসি নেই, নেই কোনো জানালার কাঁচ। শুধুমাত্র ইটের জালি আর ছাদের ফোকর দিয়ে আলো-বাতাসের এমন খেলা তৈরি করা হয়েছে যে, গরমেও সেখানে প্রশান্তি পাওয়া যায়।
আবার দেখুন স্থপতি কাশেফ চৌধুরীর সাতক্ষীরার ফ্রেন্ডশিপ হসপিটালের কাজ। তিনি বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য বিল্ডিংয়ের ভেতর দিয়ে খাল বা নালা তৈরি করেছেন, যা প্রাকৃতিকভাবে পুরো হাসপাতালকে ঠান্ডা রাখে।
নতুনদের হাতেই ভবিষ্যৎ: শুধু কি বিখ্যাত স্থপতিরাই? আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাজগুলো দেখলেও আপনি মুগ্ধ হবেন। যেমন ‘রিভার অ্যান্ড রেইন’ (River & Rain) এর কাজগুলো দেখুন। তারা কংক্রিট, ইট আর গাছপালাকে এমনভাবে মিশিয়ে দেন যে মনে হয় বিল্ডিংটা মাটির বুক ফুঁড়ে বের হয়েছে। তাদের ‘এস্কেপ ডেন’ বা অন্যান্য প্রজেক্টগুলোতে চাকচিক্য নেই, আছে প্রচুর সবুজ আর প্রশান্তি।
এছাড়াও ‘স্থাপতিক ’ (Sthapotik) বা ‘পারা’ (Paraa)-র মতো তরুণ দলগুলো বাঁশ এবং স্থানীয় মেটেরিয়াল দিয়ে অবিশ্বাস্য সব কমিউনিটি স্পেস তৈরি করছে। তারা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, আমাদের সবচেয়ে সস্তা আর অবহেলিত মেটেরিয়াল দিয়েই সবচেয়ে টেকসই এবং নান্দনিক বিল্ডিং বানানো সম্ভব।
এগুলোই হলো আমাদের আসল আর্কিটেকচার, যা প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে না বরং প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকে।
আমাদের দেশটা কোনো মরুভূমি বা বরফের দেশ নয়। তাই আমাদের বাড়িঘর কেন তাদের মতো হবে? ‘উন্নয়ন’ মানেই গ্লাস আর স্টিলের জঙ্গল নয়।
কেইলো স্টুডিও বিশ্বাস করে, সত্যিকারের সৌন্দর্য আছে আমাদের শেকড়ে, আমাদের জল-কাদা আর ইটের গাঁথুনিতে। আসুন, আমরা এমন বাড়ি বানাই যা আমাদের আবহাওয়ার সাথে মানানসই, যা আমাদের সংস্কৃতির কথা বলে। বিদেশি নকল নয়, আসুন আমরা আমাদের নিজস্বতায় গর্বিত হই।
আরো দেখুনঃ