ফেব্রুয়ারির শেষেই ঢাকার আবহাওয়ায় যে পরিমাণ গরম আর আর্দ্রতা, তাতে সামনের দিনগুলোর কথা ভাবলেই ভয় লাগে। এসি হয়তো সবচেয়ে সহজ সমাধান, কিন্তু সবার জন্য তা বাস্তবসম্মত নয়। তাছাড়া লোডশেডিংয়ের বাস্তবতা তো আছেই।
আমাদের দেশের ট্রপিক্যাল আবহাওয়ায় ঘর ঠান্ডা রাখার জন্য প্রাচীনকাল থেকেই কিছু চমৎকার কৌশল ব্যবহার হয়ে আসছে। একজন স্থপতি হিসেবে আমি সবসময় বিশ্বাস করি, শুধু দামি যন্ত্রের ওপর নির্ভর না করে স্পেস এবং দেশীয় উপাদানের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই ঘরে স্বস্তি আনা সম্ভব। আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করবো এসি ছাড়াই প্রাকৃতিকভাবে ঘর ঠান্ডা রাখার কিছু পরীক্ষিত উপায়।
গরম আর আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘর ঠান্ডা রাখার সবচেয়ে বড় উপায় হলো বাতাস চলাচল করতে দেওয়া। ঘরে মুখোমুখি জানালা থাকলে বাতাস একদিক দিয়ে ঢুকে অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যায়, যাকে আমরা ক্রস ভেন্টিলেশন বলি। কিন্তু ঢাকায় অনেক বাসাতেই এই সুবিধা থাকে না। আপনার ঘরে যদি একটাই জানালা থাকে, তবে জানালার কাছে একটি টেবিল ফ্যান এমনভাবে রাখুন যেন সেটা ভেতরের গরম বাতাস বাইরের দিকে টেনে বের করে দেয়। এতে ঘরের ভেতর একটি শূন্যস্থান তৈরি হবে এবং বাইরের ঠান্ডা বাতাস অন্য কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে ঘরে ঢুকতে বাধ্য হবে।
সারাদিন জানালা খোলা রাখলেই ঘর ঠান্ডা হয়, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাইরের বাতাস সবচেয়ে বেশি গরম থাকে। এই সময় জানালা এবং পর্দা ভালোভাবে আটকে রাখুন। সূর্য ডোবার পর বাইরের তাপমাত্রা যখন কমে আসবে, তখন সব জানালা খুলে দিন। সারাদিনের জমানো গরম বাতাস বের করে দিয়ে রাতের ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকতে দিন।
কাঁচের জানালা দিয়ে রোদ ঘরে ঢুকলে স্পেসটি খুব দ্রুত ওভেনের মতো গরম হয়ে যায়। রোদ কাঁচ ভেদ করার আগেই তা আটকে দেওয়া জরুরি। এর জন্য সবচেয়ে ভালো এবং সাশ্রয়ী উপায় হলো জানালায় ঐতিহ্যবাহী বাঁশের চিক ঝুলিয়ে দেওয়া। বাঁশের চিক রোদ আটকে দেয় ঠিকই, কিন্তু এর ফাঁকফোকর দিয়ে বাতাস ঘরে ঢুকতে পারে অনায়াসে।
ঘরের জানালা থেকে বাতাস ঢোকার রাস্তায় যদি বড় কোনো আলমারি বা সোফা থাকে, তবে বাতাস পুরো ঘরে ছড়াতে পারে না। ভারী আসবাবগুলো জানালার উল্টো দিকের দেয়ালে ঘেঁষে রাখুন। আসবাবপত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে বেত বা বাঁশের তৈরি জিনিস বেছে নিতে পারেন। এগুলো বাতাস চলাচল করতে দেয় এবং বসলে পিঠ ঘেমে যায় না। সিন্থেটিক বা স্পঞ্জের সোফার বদলে এই আবহাওয়ায় এগুলো অনেক বেশি আরামদায়ক।
আমাদের শেকড়ের সাথে জড়িয়ে থাকা একটি দারুণ জিনিস হলো শীতল পাটি। মেঝেতে বা বিছানায় শীতল পাটি বিছিয়ে রাখলে প্রাকৃতিকভাবেই অনেক ঠান্ডা অনুভূতি পাওয়া যায়। বিছানার চাদর বা পর্দার জন্য কখনোই সিন্থেটিক কাপড় ব্যবহার করবেন না। এর বদলে সুতি, লিনেন বা খাদি কাপড় বেছে নিন। এগুলো ঘাম শুষে নেয় এবং বাতাস চলাচলে সাহায্য করে।
গাছপালা পরিবেশ ঠান্ডা রাখে এটা আমরা সবাই জানি। কিন্তু ঢাকার মতো চরম আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘরের ভেতর খুব বেশি গাছ রাখলে আর্দ্রতা আরও বেড়ে গিয়ে গুমোট ভাব তৈরি হতে পারে। তাই ঘরের ভেতর অল্প গাছ রেখে বড় গাছগুলো ব্যালকনিতে রোদের দিকে রাখুন। এগুলো রোদের তেজ কমিয়ে দেবে এবং পাতার ভেতর দিয়ে ফিল্টার হয়ে যে বাতাস ঘরে ঢুকবে তা তুলনামূলকভাবে অনেক ঠান্ডা হবে।
অপ্রয়োজনীয় লাইট বা টিভি বন্ধ রাখুন, কারণ প্লাগ লাগানো থাকলেও এগুলো থেকে তাপ বের হয়। সাধারণ বাল্বের বদলে এলইডি ব্যবহার করুন। আর রান্নার সময় অবশ্যই এগজস্ট ফ্যান চালু রাখবেন, যেন রান্নাঘরের তাপ শোবার ঘরে আসতে না পারে।
একটু বুদ্ধি খাটিয়ে স্পেস আর ম্যাটেরিয়ালের সঠিক ব্যবহার করলেই এই ভ্যাপসা গরমে আপনার ঘর হয়ে উঠতে পারে প্রশান্তির জায়গা।
আরো দেখুনঃ